nav-icon.png
বন্যার প্রভাব ও মোকাবেলা
August 21, 2017
Download Attachment

বন্যার প্রভাব ও মোকাবেলা

Web Link : http://bangla.samakal.net/2017/08/21/318719


ড. মাহবুবা নাসরীন
 

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে বন্যা নতুন কোনো দুর্যোগ নয়। ভৌগোলিক অবস্থানজনিত কারণে ধ্রুপদী আলোচনায় বাংলাদেশকে বন্যাজনিত নাজুকতার অন্যতম উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়। উপমহাদেশে বন্যা আক্রান্ত হওয়ার ইতিহাস থেকে দেখা যায়, ১৭৮৬ সালে বন্যাজনিত কারণে তৎকালীন বাকেরগঞ্জে দুর্ভিক্ষের সৃষ্টি হয়। ত্রিপুরায় গোমতী নদীর বাঁধ ভেঙে সিলেট পানির নিচে তলিয়ে যায়। ১৮৩৮ সালে রাজশাহীসহ আরও কিছু জেলায় ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর মহামারী আকারে কলেরার প্রাদুর্ভাব হয়। এভাবে বন্যা সমস্যার ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায় বন্যাজনিত প্রাণহানি, গবাদিপশু, শস্য ও বাড়িঘর বিলীন হওয়ার বহু ঘটনা।

এর মাঝে ১৮৭৯ সালের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে, ব্রহ্মপুত্র নদের গতিপথ পরিবর্তনের ফলে তিস্তা নদীতে বন্যা। বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা বহুবারই ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়েছে। তবে এসব বন্যা আন্তর্জাতিক দৃষ্টি আকর্ষণ করেনি, আবার তৎকালীন শাসকরা বন্যা সমস্যা মোকাবেলায় গুরুত্বও দেননি। ১৯৫৪ ও '৫৫ সালে দুটি উপর্যুপরি বন্যা যখন ঢাকা শহরকে প্লাবিত করে, তখন থেকে বন্যা 'নিয়ন্ত্রণে' তৎকালীন সরকার গঠন করে একটি কমিশন, যা 'ত্রুক্রগ (কৎঁমম) কমিশন' হিসেবে পরিচিত। ১৯৫৬ সালে এই কমিশন বন্যা নিয়ন্ত্রণে কাঠামোগত কৌশলকেই প্রধান গুরুত্ব দেয় এবং পানি উন্নয়ন বোর্ড একটি মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করে, যার আওতায় ৬৩টি প্রকল্প বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য বাস্তবায়ন করা হয়। কিন্তু দেখা গেল, এই প্রকল্পগুলো ১৯৮৭ ও ১৯৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যাকে রুখতে ব্যর্থ হয় এবং বাংলাদেশের নদী, ভূমি ব্যবস্থা, কৃষি, মৎস্যসম্পদ ও সার্বিক পরিবেশের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। গবেষণায় পাওয়া যায়, বাংলাদেশের নদীতীরে বাঁধ দিয়ে এর প্রাকৃতিক প্রবাহকে বাধাদানের কারণে বন্যাজনিত সমস্যা বরং প্রকটই হয়েছে। স্থানীয় জলবায়ু সম্পর্কে জ্ঞান আহরণ ছাড়া অপরিকল্পিতভাবে অবকাঠামো নির্মাণ বন্যার ভয়াবহতাকে আরও তীব্র করেছে।

জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণগুলো বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশকে বিশেষভাবে ক্ষতি করছে বলেও প্রমাণিত। কারণ শিল্পায়নের পর থেকে বৃষ্টিপাতের পরিমাণের তারতম্য লক্ষণীয়। কমনওয়েলথ সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ অর্গানাইজেশন (পংরৎড়) একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, বাংলাদেশ, ভারত, ভিয়েতনাম, চীন এবং একটি প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ২০৭০ সালের মধ্যে লাখ লাখ মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়বে শুধু সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে। বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে প্রতিনিয়ত অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, খরা, নদীভাঙন ও বন্যাজনিত সমস্যার মধ্য দিয়ে মোকাবেলা করছে। প্রায় সব ঋতুতেই এখানে গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ১০০ মিলিমিটারের মতো বেড়েছে। ভৌগোলিক অবস্থানে আমাদের দেশটি হিমালয়ে উৎপন্ন নদী অববাহিকার একটি ব-দ্বীপ। আমাদের দেশে যে বন্যার পানি আসে তার ৯২ শতাংশ প্রতিবেশী উজানের দেশগুলো থেকে। ব্রহ্মপুত্র, গঙ্গা, মেঘনা ও দক্ষিণ-পূর্ব পাহাড়ি অববাহিকার নদীগুলোর বৃষ্টিপাতের তুলনায় আমাদের দেশের অভ্যন্তরের নদীগুলোর বৃষ্টিপাতের পরিমাণ অত্যন্ত কম। বন্যার পানির ৮ শতাংশ দেশের অভ্যন্তরের বৃষ্টিপাতের ফলে সৃষ্ট। এতে জলবায়ু পরিবর্তন যেমন দায়ী, তেমনি বন নিধন, নদীর তলদেশ ভরাট করা বা গভীরতা কমে যাওয়া; নদীতে জেগে ওঠা চরসহ বিভিন্ন কারণে বন্যার প্রকোপে মানুষের দুর্ভোগ বেড়ে যায়। কৃষিপ্রধান বাংলার মানুষ তাদের লোকপ্রিয় প্রবাদে আজ আর বন্যায় সতর্ক হতে পারে না। যেমন খনার বচন_ 'পূর্ব আষাঢ়ে দক্ষিণা বয়, সেই বছর বন্যা নয়'_ এসব মানুষ ভুলে যেতে বসেছে।

এবার যে বন্যা সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে তার দুটি দিক আছে। প্রধানত আগস্ট মাসের এই বন্যা কৃষিপ্রধান উত্তরাঞ্চলের যাদের বিশেষত এক ফসলি; তাদের অসহায়ত্ব। ফসলের পরিপূর্ণতা আসার আগেই বন্যায় সেগুলোর ক্ষতি। সঙ্গে আছে কাঁচা ঘরবাড়ি ও অন্যান্য অবকাঠামোর ক্ষতি। ক্ষতির পরিমাণ সাধারণত বন্যা-পরবর্তী সময়ে সরকার যাচাই করে থাকে। দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে, কোনো কোনো এলাকা যেমন দিনাজপুর ও ঠাকুরগাঁও অঞ্চলের মানুষ সুদূর অতীতে এ রকম বন্যা দেখেনি। যেমনটি দেখে থাকে বন্যাপ্রবণ অঞ্চলের মানুষ। তাই প্রতিনিয়ত বন্যার সঙ্গে বসবাস করা মানুষদের সম্পদ রক্ষা করা বা তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিতে ও অন্যান্য প্রস্তুতিতে ঘুরে দাঁড়ানোর যুদ্ধে শামিল হতে পারলেও অনভ্যস্তদের নাজুকতা একটু বেশি দেখা গেছে। যেমনটি দেখা গিয়েছিল ২০০০ সালে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে। আমরা যখন প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিভিন্ন দুর্যোগ প্রত্যক্ষ করি, তখন মানুষের গৃহভিত্তিক প্রস্তুতির ব্যবধান স্পষ্ট হয়। বাংলাদেশ ধীরে ধীরে দুর্যোগ মোকাবেলার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। যে দুটি দুর্যোগ বেশি হয় যেমন, ঘূর্ণিঝড় ও বন্যা_ এগুলো মোকাবেলায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালে ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কমিটি ও ওই বছরেই বন্যা সতর্কীকরণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু পরবর্তী সরকারি পদক্ষেপে বন্যা নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দিয়ে সতর্কীকরণ বা বন্যা ব্যবস্থাপনার ওপর তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। বর্তমানে ঘূর্ণিঝড়ের সময়ে মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া যায় সতর্কীকরণ বার্তার মাধ্যমে। এ বছরের আগস্ট মাসের বড় বড় নদীর পানি বিপদসীমার ৫০ থেকে ১০০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হবে_ এ বার্তা এক সপ্তাহ আগে থেকে পাওয়া সত্ত্বেও বন্যা আক্রান্ত মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যায়নি। হয়তো এখানে আরও সতর্ক থাকা প্রয়োজন ছিল। প্রয়োজন ছিল আরও প্রস্তুতির। বাংলাদেশ যে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় পারদর্শী, তা বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। তাই এবারের বন্যা মোকাবেলায় আমাদের দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ থাকতে হবে।

আমার ৩০ বছরের বন্যা নিয়ে গবেষণার অভিজ্ঞতা বলে, বন্যা-পরবর্তী সময়ে মানুষ তার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও দৃঢ় মনোবল নিয়ে শুরু করে। কিন্তু যখন পানিবন্দি, গৃহহীন হয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যায়, সামান্য সম্পদ নিয়ে তখন তাদের নির্ভরশীলতা বেড়ে যায়। তাই বন্যাকালীন ও বন্যা-পরবর্তী দুটি সময়ে প্রয়োজনীয় সব সহায়তা নিয়ে পাশে দাঁড়াতে হবে। এবারের বন্যার ভয়াবহতা বিবেচনায় সরকারি প্রস্তুতি আছে, তবে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সম্মিলিত সহায়তা বন্যার্ত মানুষকে আশান্বিত ও উপকৃত করবে। বন্যা-পরবর্তী পুনর্বাসন, বন্যাজনিত রোগের প্রাদুর্ভাব থেকে তাদের দূরে রাখা, শিশু-নারী-প্রতিবন্ধী এবং বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত পেশাজীবী ও ব্যক্তিদের সহায়তা দীর্ঘমেয়াদি করা_ সবই বন্যা-পরবর্তী পদক্ষেপ। শুধু ত্রাণ বিতরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে আমরা যেন নিজেদের দায়মুক্ত না ভাবি। যতদিন অবকাঠামো পূর্বাবস্থায় না ফিরছে, ততদিন বন্যাপীড়িত মানুষদের সাহস জোগাতে হবে। এবারের বন্যার্তদের পাশে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী-শিক্ষকসহ বিভিন্ন সংগঠনও পাশে দাঁড়াচ্ছে, যা পূর্ববর্তী কয়েকটি দুর্যোগে সেভাবে চোখে পড়েনি। এখানেই প্রমাণ পাওয়া যায়_ 'মানুষ মানুষের জন্য।' শুধু 'অপ্রতুল ত্রাণ'_ এই প্রচারণায় যেন গণমাধ্যম সীমিত না থাকে। বরং সরকারের বন্যা ব্যবস্থাপনার ইতিবাচক দিক তুলে ধরাসহ আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় ও তার মাধ্যমে বন্যা-পরবর্তী দুর্ভোগ কমাতে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ও কর্মকাণ্ডের বাস্তব চিত্রও তুলে ধরতে হবে অব্যাহতভাবে। আমাদের ভুললে চলবে না, বছরব্যাপী প্রস্তুতিই দুুর্যোগ মোকাবেলার শক্তিশালী হাতিয়ার।

পরিচালক, ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার

ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভালনারেবিলিটি স্টাডিজ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়